চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড ও কুমিরার সমুদ্রতীরে গড়ে উঠেছে জাহাজ ভাঙা শিল্প। গত দুই দশকে দেশে অবকাঠামোগত উন্নয়ন বৃদ্ধি পাওয়ায় ইস্পাত শিল্পের চাহিদাও বাড়তে থাকে। ফলে এ শিল্পের কাঁচামালের বড় হাব হয়ে ওঠে চট্টগ্রাম অঞ্চলের দেড় শতাধিক শিপইয়ার্ড। কিন্তু বিশ্ববাজারে মন্দার কারণে গত কয়েক বছরে পুরনো জাহাজ আমদানি কমে অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। অথচ এক দশক আগেও বছরে প্রায় ২৫ লাখ টন পুরনো জাহাজ স্ক্র্যাপ হিসেবে আমদানি করা হতো। অথচ চলতি বছরে তা ১০ লাখ টনের নিচে নেমে যেতে পারে। অর্থাৎ এক দশকে দেশে স্ক্র্যাপ জাহাজের আমদানি কমেছে প্রায় ৬০ শতাংশ। ফলে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে একের পর এক ইয়ার্ড। শ্রমিকরাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন এ খাত থেকে।
শিল্প মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ শিপ ব্রেকার্স অ্যান্ড রিসাইক্লার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসবিআরএ) তথ্যমতে, দেশে ২০১৫ সালে ২৪ লাখ ৮৮ হাজার ৮৪৪ টনের ২৩১টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়। নয় বছর পর ২০২৩ সালে আমদানি করা হয় ১০ লাখ ২২ হাজার ১১০ টনের ১৭৩টি জাহাজ। তবে চলতি বছরের অক্টোবর মাস পর্যন্ত প্রায় আট লাখ টনের ১৩০টি স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করা হয়েছে। বাকি তিন মাসে দুই লাখ টন জাহাজ আমদানির সম্ভাবনা কম বলে জানিয়েছেন এ সংশ্লিষ্টরা। অর্থাৎ এ এক দশকে স্ক্র্যাপ জাহাজের আমদানি কমেছে প্রায় ১৪ লাখ টনের বেশি বা ৬০ শতাংশ।
কভিড মহামারীর সময়ে বিশ্ববাজারে মন্দা দেখা দিলে জাহাজ ভাঙা শিল্পে এর প্রভাব পড়ে। এলসি ও ডলার সংকটের কারণে আমদানিতে বড় ধাক্কা খায় খাতটি। ব্যাংক ঋণের সুদ বেড়ে যাওয়ায় জাহাজ আমদানি কমতে শুরু করে, ফলে ইয়ার্ড ব্যবসা গুটিয়ে নেন অনেককে। ২০২০ সাল থেকে এখন পর্যন্ত অর্ধশতাধিক শিপইয়ার্ড বন্ধ হয়ে গেছে। এর প্রভাব পড়েছে স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানিতেও। ২০২১ সালে যেখানে ২৭ লাখ টনের বেশি স্ক্র্যাপ আমদানি করা হয়েছিল ২০২২ সালে সেটা একলাফে নেমে আসে ১১ লাখ ৪৫ হাজার ৩২৪ টনে। ২০২৩ সালে কমে দাঁড়ায় ১০ লাখ ২২ হাজার ১১০ টনের ১৭৩টি জাহাজ। চলতি বছরে সেটা ১০ লাখ টনের নিচে নামার সম্ভাবনা বেশি।
বিএসবিআরএর সর্বশেষ হালনাগাদ তথ্য অনুযায়ী, ১১৬টি শিপইয়ার্ডের তালিকা থাকলেও প্রাথমিক অনুমোদন রয়েছে ১০৫টির। বর্তমানে ৩০-৩৫টি শিপইয়ার্ড নিয়মিত স্ক্র্যাপ জাহাজ আমদানি করে কার্যক্রম চালু রেখেছে। তবে এক দশক আগেও ১৮৫টি শিপইয়ার্ড নিবন্ধিত ছিল। এছাড়া গ্রিন শিপইয়ার্ডের সংখ্যা পাঁচটি।
বিএসবিআরএর সহকারী সচিব মো. নাজমুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এলসি ও ডলার সংকটের কারণে বড় জাহাজ আমদানি করা সম্ভব হচ্ছে না। তাই ছোট ছোট জাহাজ এনে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। তবে গত দুই বছর এ শিল্প খাতকে কমলা থেকে লাল শ্রেণীতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাহাজ কাটার অনুমতি নিতে ঢাকার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ায় আমরা বড় সংকটে পড়েছি।’
তিনি আরো জানান, বর্তমানে একটি স্ক্র্যাপ জাহাজ বন্দর দিয়ে কাস্টমস হয়ে ইয়ার্ডে বিচিং হলেও অনুমোদনের অপেক্ষায় ফেলে রাখতে হচ্ছে। যার কারণে এ খাত নিয়ে বড় সংকটের মধ্যে আছেন উদ্যোক্তারা। দেশের সবক’টি ইয়ার্ডকে গ্রিন ইয়ার্ডে রূপান্তর করা না হলে এ খাত আরো বড় সংকটে পড়বে।
ব্যবসায়ীরা বলছেন দেশে ডলার সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে থাকা বড় জাহাজগুলোর নিলামে আগের মতো অংশ নিতে পারছেন না বাংলাদেশী ব্যবসায়ীরা। যার কারণে তিন থেকে সাত হাজার টনের ছোট পুরনো জাহাজ কিনতে বাধ্য হচ্ছেন তারা। এছাড়া বাজারের দামের সঙ্গে কেনা দামের পার্থক্য থাকায় বাজারে স্ক্র্যাপ বিক্রি করেও লাভের মুখ দেখা যাচ্ছে না। যার কারণে স্ক্র্যাপ ব্যবসায় আগের মতো লাভ নেই।
গত এক দশকে স্ক্র্যাপ জাহাজের আমদানি কমে যাওয়ায় তার বড় প্রভাব পড়েছে শ্রমিকদের ওপর। এক সময় লক্ষাধিক শ্রমিক এসব ইয়ার্ডে কাজ করলেও এখন সেটা কমে ১০ থেকে ১২ হাজারে নেমে এসেছে।
বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ইপসার সিনিয়র কর্মকর্তা মোহাম্মদ আলী শাহীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘নানা সংকটময় পরিস্থিতির জন্য জাহাজ ভাঙা শিল্প খাত তার অবস্থান ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ছাড়াও দেশের আর্থিক অবস্থা স্থিতিশীল না থাকায় এ খাতে আগের ভালো অবস্থা নেই।’